আধুনিক সভ্যতার চাকচিক্য আমাদের অনেক কিছু দিলেও কেড়ে নিয়েছে অতি মূল্যবান এক সম্পদ— 'আত্মীয়তার বন্ধন'। বর্তমান সমাজে এক অদ্ভুত বিচ্ছিন্নতা জেঁকে বসেছে।
যে রক্ত সম্পর্কের টানে মানুষ এক সময় মাইলের পর মাইল পাড়ি দিয়ে একে অপরের সাথে দেখা করতে যেত, আজ সেই টান যেন কেবল যান্ত্রিকতায় বন্দি।
অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, একই বংশের সন্তানরা একে অপরকে চিনতে পারছে না, অথচ তারা হয়তো একই শহরে বসবাস করছে।
পরিচয়হীন নতুন প্রজন্ম
আমাদের বর্তমান প্রজন্ম বড় হচ্ছে এক ধরনের 'সামাজিক বিচ্ছিন্নতার' মধ্য দিয়ে। আগেকার দিনে চাচাতো, ফুফাতো কিংবা খালাতো ভাইবোনদের সাথে শৈশব কাটানোর যে সুযোগ ছিল, এখন তা কেবল ঈদ বা বিশেষ উৎসবে সীমাবদ্ধ।
ফলে এমন অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটছে যে, রাস্তায় বা কর্মক্ষেত্রে কোনো কারণে তর্কে জড়িয়ে পড়ার পর হয়তো প্রবীণ কোনো আত্মীয়ের মধ্যস্থতায় জানা যাচ্ছে— তারা আসলে সহোদর ভাই বা অতি আপন আত্মীয়। এই যে ‘চেনা মানুষের অচেনা হয়ে যাওয়া’—এটি কেবল একটি সামাজিক বিচ্যুতি নয়, বরং একটি বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদী সংকটের সংকেত।
দূরত্বের অন্তরালে স্বার্থ ও বৈষম্য
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই দূরত্বের মূলে রয়েছে কিছু বৈষয়িক ও মানসিক কারণ,
সম্পত্তি ও অর্থলিপ্সা: অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় কোনো প্রভাবশালী আত্মীয় অন্য দুর্বল আত্মীয়ের জমি বা সম্পদ আত্মসাৎ করছে। এই যে ঠকানোর প্রবণতা, তা সম্পর্কের মাঝে এক অদৃশ্য দেওয়াল তুলে দিচ্ছে।
আভিজাত্যের অহংকার:
বর্তমান সময়ে মানুষের পরিচয় নির্ধারিত হচ্ছে তার পদমর্যাদা আর ব্যাংক ব্যালেন্স দিয়ে। ধনী আত্মীয়রা অনেক সময় তাদের দরিদ্র আত্মীয়দের পরিচয় দিতে বা তাদের সাথে মিশতে কুণ্ঠাবোধ করেন। ফলে তৈরি হচ্ছে বিশাল এক শ্রেণিবৈষম্য।
এককেন্দ্রিক জীবনদর্শন: "আমি এবং আমার ছোট পরিবার"— এই সংকীর্ণ মানসিকতা মানুষকে সমাজচ্যুত করছে।
ধর্মীয় মানদণ্ড ও নৈতিক অবক্ষয়।
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা কেবল সামাজিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি বাধ্যতামূলক ইবাদত। রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, "আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না" (বুখারি: ৫৯৮৪)। পবিত্র কুরআনেও বারবার আত্মীয়ের অধিকার আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অথচ এই স্পষ্ট ধর্মীয় নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও মানুষ ক্ষুদ্র স্বার্থের লোভে সম্পর্কের সুতো ছিঁড়ে ফেলছে।
আমাদের করণীয় কী?
বন্ধন টিকিয়ে রাখা কেবল প্রবীণদের কাজ নয়, বরং এর মূলে থাকতে হবে বড়দের সঠিক দিকনির্দেশনা।
১. সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই পারিবারিক বৃক্ষ বা 'ফ্যামিলি ট্রি' সম্পর্কে ধারণা দেওয়া।
২. মান-অভিমান ভুলে নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া।
৩. বিপদে-আপদে সাধ্যমতো একে অপরের পাশে দাঁড়ানো।
৪. ভার্চুয়াল জগতের বাইরে গিয়ে স্বশরীরে দেখা করার অভ্যাস গড়ে তোলা।
মানুষ একা বাঁচতে পারে না। আত্মীয়-স্বজন হলো সেই শিকড়, যা মানুষকে প্রতিকূল সময়ে শক্তভাবে ধরে রাখে। আমরা যদি আমাদের অহংকার আর স্বার্থকে বিসর্জন দিতে না পারি, তবে অচিরেই আমরা এমন এক সমাজ পাব যেখানে মানুষ ভিড়ের মাঝেও থাকবে চরম একা।
রক্তের টান বজায় থাকুক, প্রবীণদের অভিজ্ঞতা আর নবীনদের উদ্যমে পূর্ণ হোক প্রতিটি পরিবার।

মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬
আধুনিক সভ্যতার চাকচিক্য আমাদের অনেক কিছু দিলেও কেড়ে নিয়েছে অতি মূল্যবান এক সম্পদ— 'আত্মীয়তার বন্ধন'। বর্তমান সমাজে এক অদ্ভুত বিচ্ছিন্নতা জেঁকে বসেছে।
যে রক্ত সম্পর্কের টানে মানুষ এক সময় মাইলের পর মাইল পাড়ি দিয়ে একে অপরের সাথে দেখা করতে যেত, আজ সেই টান যেন কেবল যান্ত্রিকতায় বন্দি।
অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, একই বংশের সন্তানরা একে অপরকে চিনতে পারছে না, অথচ তারা হয়তো একই শহরে বসবাস করছে।
পরিচয়হীন নতুন প্রজন্ম
আমাদের বর্তমান প্রজন্ম বড় হচ্ছে এক ধরনের 'সামাজিক বিচ্ছিন্নতার' মধ্য দিয়ে। আগেকার দিনে চাচাতো, ফুফাতো কিংবা খালাতো ভাইবোনদের সাথে শৈশব কাটানোর যে সুযোগ ছিল, এখন তা কেবল ঈদ বা বিশেষ উৎসবে সীমাবদ্ধ।
ফলে এমন অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটছে যে, রাস্তায় বা কর্মক্ষেত্রে কোনো কারণে তর্কে জড়িয়ে পড়ার পর হয়তো প্রবীণ কোনো আত্মীয়ের মধ্যস্থতায় জানা যাচ্ছে— তারা আসলে সহোদর ভাই বা অতি আপন আত্মীয়। এই যে ‘চেনা মানুষের অচেনা হয়ে যাওয়া’—এটি কেবল একটি সামাজিক বিচ্যুতি নয়, বরং একটি বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদী সংকটের সংকেত।
দূরত্বের অন্তরালে স্বার্থ ও বৈষম্য
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই দূরত্বের মূলে রয়েছে কিছু বৈষয়িক ও মানসিক কারণ,
সম্পত্তি ও অর্থলিপ্সা: অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় কোনো প্রভাবশালী আত্মীয় অন্য দুর্বল আত্মীয়ের জমি বা সম্পদ আত্মসাৎ করছে। এই যে ঠকানোর প্রবণতা, তা সম্পর্কের মাঝে এক অদৃশ্য দেওয়াল তুলে দিচ্ছে।
আভিজাত্যের অহংকার:
বর্তমান সময়ে মানুষের পরিচয় নির্ধারিত হচ্ছে তার পদমর্যাদা আর ব্যাংক ব্যালেন্স দিয়ে। ধনী আত্মীয়রা অনেক সময় তাদের দরিদ্র আত্মীয়দের পরিচয় দিতে বা তাদের সাথে মিশতে কুণ্ঠাবোধ করেন। ফলে তৈরি হচ্ছে বিশাল এক শ্রেণিবৈষম্য।
এককেন্দ্রিক জীবনদর্শন: "আমি এবং আমার ছোট পরিবার"— এই সংকীর্ণ মানসিকতা মানুষকে সমাজচ্যুত করছে।
ধর্মীয় মানদণ্ড ও নৈতিক অবক্ষয়।
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা কেবল সামাজিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি বাধ্যতামূলক ইবাদত। রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, "আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না" (বুখারি: ৫৯৮৪)। পবিত্র কুরআনেও বারবার আত্মীয়ের অধিকার আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অথচ এই স্পষ্ট ধর্মীয় নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও মানুষ ক্ষুদ্র স্বার্থের লোভে সম্পর্কের সুতো ছিঁড়ে ফেলছে।
আমাদের করণীয় কী?
বন্ধন টিকিয়ে রাখা কেবল প্রবীণদের কাজ নয়, বরং এর মূলে থাকতে হবে বড়দের সঠিক দিকনির্দেশনা।
১. সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই পারিবারিক বৃক্ষ বা 'ফ্যামিলি ট্রি' সম্পর্কে ধারণা দেওয়া।
২. মান-অভিমান ভুলে নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া।
৩. বিপদে-আপদে সাধ্যমতো একে অপরের পাশে দাঁড়ানো।
৪. ভার্চুয়াল জগতের বাইরে গিয়ে স্বশরীরে দেখা করার অভ্যাস গড়ে তোলা।
মানুষ একা বাঁচতে পারে না। আত্মীয়-স্বজন হলো সেই শিকড়, যা মানুষকে প্রতিকূল সময়ে শক্তভাবে ধরে রাখে। আমরা যদি আমাদের অহংকার আর স্বার্থকে বিসর্জন দিতে না পারি, তবে অচিরেই আমরা এমন এক সমাজ পাব যেখানে মানুষ ভিড়ের মাঝেও থাকবে চরম একা।
রক্তের টান বজায় থাকুক, প্রবীণদের অভিজ্ঞতা আর নবীনদের উদ্যমে পূর্ণ হোক প্রতিটি পরিবার।

আপনার মতামত লিখুন