কক্সবাজার, ২০ নভেম্বর ২০২৫ — দেশের লবণ উৎপাদনের প্রধান এলাকা কক্সবাজার জেলায় শুরু হয়েছে গভীর সংকট। উৎপাদন খরচ লাগামহীনভাবে বৃদ্ধি পেলেও বাজারমূল্য বিপরীতমুখী, ফলে প্রতি মণে চাষিদের লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৬০ টাকা। জেলার চাষি এবং লবণ-মিল মালিকরা মারাত্মক অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়েছেন।
কক্সবাজারের কুতুবদিয়া, চকরিয়া, সদর, রামু ও টেকনাফ উপজেলাগুলো দেশের মোট লবণ উৎপাদনের ৮৭% পর্যন্ত সরবরাহ করে। কুতুবদিয়ার বিস্তীর্ণ দ্বীপ এলাকা, চকরিয়ার মোঘরঝর্ণা ও ডুলাহাজারা, সদর ও রামুর উপকূলীয় মাঠ এবং টেকনাফের বালিয়াড়ি অঞ্চলগুলো লবণের প্রধান উৎপাদন ক্ষেত্র। এখানকার চাষিরা বলছেন, বর্তমানে মাঠ প্রস্তুতি, পলিথিন, শ্রমিক মজুরি, সেচ এবং পরিবহন খরচ মিলিয়ে প্রতি মণে খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০০ টাকা, কিন্তু বিক্রয়মূল্য মাত্র ১৩০–১৫০ টাকা।
কুতুবদিয়ার চাষি নুরুল আলম জানান, "যে লবণ উৎপাদনে চারশো টাকা খরচ হয়, সেটা ১৪০ টাকায় বিক্রি করে টিকে থাকা সম্ভব নয়। মাঠ চালানো এখন চরম কঠিন হয়ে গেছে।" অনেক চাষি ঋণ নিয়ে মৌসুম শুরু করেছেন, তাই তাদের আর্থিক পরিস্থিতি আরও সংকীর্ণ হয়েছে।
স্থানীয় লবণ চাষি ও মিল মালিকরা বিদেশি সোডিয়াম সালফেটের বাজারে প্রবেশকেই সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন। নিয়ন্ত্রণহীন আমদানির ফলে স্থানীয় মিল মালিকরা সস্তা বিদেশি লবণ কিনে স্থানীয় চাষিদের প্রতি আস্থা হারাচ্ছেন। জেলা লবণ চাষী কল্যাণ সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট শাহাবউদ্দিন বলেন, "বিদেশি লবণ বাজার দখল করে স্থানীয় শিল্পকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছে। সরকার কঠোরভাবে আমদানি নিয়ন্ত্রণ না করলে পুরো শিল্পই বিপন্ন হবে।"
বিসিক কক্সবাজারের পরিচালক জাফর ইকবাল জানান, অনেক উৎপাদক সঠিক নিয়ম মেনে লবণ উত্তোলন করছেন না, যার ফলে গুণগত মানে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। তিনি বলেন, "যদি চাষিরা সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেন, উৎপাদন খরচ কমানো সম্ভব এবং মিল মালিকরা স্থানীয় লবণের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারবেন।"
সম্প্রতি শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান কক্সবাজার সফরে চাষি ও মিল মালিকদের সঙ্গে বৈঠকে জানান, খাদ্য লবণ আমদানির নিয়ন্ত্রণ করা হবে। এছাড়া বিদেশি লবণ বন্দর থেকে খালাসের আগে পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, স্থানীয় শিল্পকে রক্ষা করতে নীতিগত সুরক্ষা কার্যকর করা হবে।
বর্তমান মৌসুমে জেলার ৪১ হাজারেরও বেশি চাষি প্রায় ২৭ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন লবণ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রযুক্তিনির্ভর চাষ পদ্ধতি ও প্রক্রিয়াজাতকরণের আধুনিকায়ন এবং ন্যূনতম দাম নির্ধারণের মাধ্যমে কক্সবাজারের লবণ শিল্পকে স্থায়ীভাবে রক্ষা করা সম্ভব।
দেশের খাদ্যশিল্পে ব্যবহার হওয়া লবণের বেশিরভাগই আসে কক্সবাজারের চাষিদের হাত দিয়ে। তাই এই শিল্পের সংকট শুধু চাষিদের নয়, পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও প্রভাব ফেলবে। সরকারের নীতি এবং বাজার নিয়ন্ত্রণ না থাকলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পের টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে।

মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ নভেম্বর ২০২৫
কক্সবাজার, ২০ নভেম্বর ২০২৫ — দেশের লবণ উৎপাদনের প্রধান এলাকা কক্সবাজার জেলায় শুরু হয়েছে গভীর সংকট। উৎপাদন খরচ লাগামহীনভাবে বৃদ্ধি পেলেও বাজারমূল্য বিপরীতমুখী, ফলে প্রতি মণে চাষিদের লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৬০ টাকা। জেলার চাষি এবং লবণ-মিল মালিকরা মারাত্মক অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়েছেন।
কক্সবাজারের কুতুবদিয়া, চকরিয়া, সদর, রামু ও টেকনাফ উপজেলাগুলো দেশের মোট লবণ উৎপাদনের ৮৭% পর্যন্ত সরবরাহ করে। কুতুবদিয়ার বিস্তীর্ণ দ্বীপ এলাকা, চকরিয়ার মোঘরঝর্ণা ও ডুলাহাজারা, সদর ও রামুর উপকূলীয় মাঠ এবং টেকনাফের বালিয়াড়ি অঞ্চলগুলো লবণের প্রধান উৎপাদন ক্ষেত্র। এখানকার চাষিরা বলছেন, বর্তমানে মাঠ প্রস্তুতি, পলিথিন, শ্রমিক মজুরি, সেচ এবং পরিবহন খরচ মিলিয়ে প্রতি মণে খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০০ টাকা, কিন্তু বিক্রয়মূল্য মাত্র ১৩০–১৫০ টাকা।
কুতুবদিয়ার চাষি নুরুল আলম জানান, "যে লবণ উৎপাদনে চারশো টাকা খরচ হয়, সেটা ১৪০ টাকায় বিক্রি করে টিকে থাকা সম্ভব নয়। মাঠ চালানো এখন চরম কঠিন হয়ে গেছে।" অনেক চাষি ঋণ নিয়ে মৌসুম শুরু করেছেন, তাই তাদের আর্থিক পরিস্থিতি আরও সংকীর্ণ হয়েছে।
স্থানীয় লবণ চাষি ও মিল মালিকরা বিদেশি সোডিয়াম সালফেটের বাজারে প্রবেশকেই সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন। নিয়ন্ত্রণহীন আমদানির ফলে স্থানীয় মিল মালিকরা সস্তা বিদেশি লবণ কিনে স্থানীয় চাষিদের প্রতি আস্থা হারাচ্ছেন। জেলা লবণ চাষী কল্যাণ সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট শাহাবউদ্দিন বলেন, "বিদেশি লবণ বাজার দখল করে স্থানীয় শিল্পকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছে। সরকার কঠোরভাবে আমদানি নিয়ন্ত্রণ না করলে পুরো শিল্পই বিপন্ন হবে।"
বিসিক কক্সবাজারের পরিচালক জাফর ইকবাল জানান, অনেক উৎপাদক সঠিক নিয়ম মেনে লবণ উত্তোলন করছেন না, যার ফলে গুণগত মানে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। তিনি বলেন, "যদি চাষিরা সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করেন, উৎপাদন খরচ কমানো সম্ভব এবং মিল মালিকরা স্থানীয় লবণের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারবেন।"
সম্প্রতি শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান কক্সবাজার সফরে চাষি ও মিল মালিকদের সঙ্গে বৈঠকে জানান, খাদ্য লবণ আমদানির নিয়ন্ত্রণ করা হবে। এছাড়া বিদেশি লবণ বন্দর থেকে খালাসের আগে পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, স্থানীয় শিল্পকে রক্ষা করতে নীতিগত সুরক্ষা কার্যকর করা হবে।
বর্তমান মৌসুমে জেলার ৪১ হাজারেরও বেশি চাষি প্রায় ২৭ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন লবণ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রযুক্তিনির্ভর চাষ পদ্ধতি ও প্রক্রিয়াজাতকরণের আধুনিকায়ন এবং ন্যূনতম দাম নির্ধারণের মাধ্যমে কক্সবাজারের লবণ শিল্পকে স্থায়ীভাবে রক্ষা করা সম্ভব।
দেশের খাদ্যশিল্পে ব্যবহার হওয়া লবণের বেশিরভাগই আসে কক্সবাজারের চাষিদের হাত দিয়ে। তাই এই শিল্পের সংকট শুধু চাষিদের নয়, পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও প্রভাব ফেলবে। সরকারের নীতি এবং বাজার নিয়ন্ত্রণ না থাকলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পের টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে।

আপনার মতামত লিখুন