দৈনিক উত্তরের নিউজ
প্রকাশ : শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬

কিশোরগঞ্জ পিডব্লিউতে ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ: তদারকির দায়িত্ব যাঁর, প্রশ্নের মুখে তিনিই

কিশোরগঞ্জ পিডব্লিউতে ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ: তদারকির দায়িত্ব যাঁর, প্রশ্নের মুখে তিনিই

চেকরেল বিতর্ক থামার আগেই কিশোরগঞ্জ পিডব্লিউ দপ্তরকে ঘিরে নতুন করে বিস্ফোরক অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। মাঠপর্যায়ে কর্মীদের অনুপস্থিতি, কাজ না করেই বেতন উত্তোলন, বদলি বাণিজ্য এবং গেইটম্যানদের কাছ থেকে মাসিক অর্থ আদায়ের অভিযোগ মিলিয়ে দপ্তরটির কার্যক্রম নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্য বলছে, দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার নজরদারিতেই যেন অনিয়মগুলো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিচ্ছে।

তথ্য অনুযায়ী, রেললাইনের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা একাধিক গ্যাং সদস্য নিয়মিত কর্মস্থলে না গিয়েও বেতন তুলছেন। অফিস নথিতে গ্যাং নং–০৭ এর চার সদস্যের প্রতিদিন সকাল সাড়ে সাতটায় ২৭৪ থেকে ২৮১ নম্বর পিলার পর্যন্ত কাজ করার কথা উল্লেখ থাকলেও এপ্রিল মাসের বিভিন্ন দিনে সরেজমিনে গিয়ে সেখানে কোনো কর্মীর উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। বিষয়টি জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা দাবি করেন দলটি নরসিংদীতে কাজ করছে। কিন্তু টাইমকিপারের বক্তব্যে উঠে আসে ভিন্ন তথ্য—তিনি জানান দলটি ভৈরবে কর্মরত। একই গ্যাংকে ঘিরে এই দ্বৈত বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও সন্দেহজনক করে তুলেছে।

গ্যাং নং–০৯ সম্পর্কেও পাওয়া গেছে একই ধরনের অসঙ্গতি। টাইমকিপারের তথ্য অনুযায়ী দলটি নীলগঞ্জ স্টেশনের ২৮৮ থেকে ২৯৪ নম্বর পিলারে কাজ করছে। কিন্তু সেখানে গিয়ে কোনো কর্মীর দেখা মেলেনি। পরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা প্রথমে দুইজন কাজ করছেন বলে দাবি করলেও পরে বলেন তারা ছুটিতে আছেন। অথচ গ্যাংটিতে আটজন সদস্য থাকার কথা। বাকিদের অবস্থান নিয়ে কোনো স্পষ্ট জবাব পাওয়া যায়নি।

অনুসন্ধানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক যে চিত্র উঠে এসেছে তা হলো বদলি বাণিজ্য। অভিযোগ রয়েছে, একাধিক কর্মী দায়িত্বে না থেকেও বেতন নিচ্ছেন এবং টাকার বিনিময়ে অন্যদের দিয়ে কাজ করাচ্ছেন। বিভিন্ন গ্যাংয়ের একাধিক সদস্যের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমনকি সরেজমিনে কথা বলা এক বদলি শ্রমিক জানান, তাকে দীর্ঘদিন ধরে অন্যের স্থলে কাজ করতে দেওয়া হয়েছে এবং এ বিষয়ে অফিস থেকেও অনুমতির কথা বলা হয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি চাকরির দায়িত্ব কি ব্যক্তিগতভাবে অন্যকে দিয়ে করানো যায়?

অভিযোগ আরও রয়েছে, দায়িত্বস্থল কিশোরগঞ্জ হলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে অফিসে খুব কম দেখা যায়। অফিস সময়ের বড় অংশ তিনি অন্য জেলায় অবস্থান করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে তার বক্তব্য—কিশোরগঞ্জে সব সময় থাকা জরুরি নয়। দায়িত্বশীল পদে থাকা একজন কর্মকর্তার এমন মন্তব্য স্থানীয়দের বিস্মিত করেছে।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ এসেছে ভৈরব বাজার থেকে আঠারোবাড়ি পর্যন্ত প্রকল্পে কর্মরত ৪৮ জন গেইটম্যানকে ঘিরে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রত্যেকের কাছ থেকে মাসে এক থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। মধ্যস্থতার মাধ্যমে এ অর্থ নিয়মিত সংগ্রহ করা হয় বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গেইটম্যান জানান, দীর্ঘ সময় ডিউটি করার শর্তে মাসিক টাকা দিতে বাধ্য করা হয়।

রেলপথের নিরাপত্তা সরাসরি জননিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। সেখানে কর্মীদের অনুপস্থিতি, বদলি দিয়ে দায়িত্ব পালন এবং বেতন উত্তোলনের অভিযোগ শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতাই নয়, সম্ভাব্য বড় ঝুঁকির ইঙ্গিতও বহন করছে। সরকারি অর্থ ব্যবহারের স্বচ্ছতা নিয়েও তৈরি হয়েছে গভীর সন্দেহ।

ধারাবাহিক এসব অভিযোগে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং দপ্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি এখন জোরালো হয়ে উঠেছে।

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক উত্তরের নিউজ

শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬


কিশোরগঞ্জ পিডব্লিউতে ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ: তদারকির দায়িত্ব যাঁর, প্রশ্নের মুখে তিনিই

প্রকাশের তারিখ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

চেকরেল বিতর্ক থামার আগেই কিশোরগঞ্জ পিডব্লিউ দপ্তরকে ঘিরে নতুন করে বিস্ফোরক অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। মাঠপর্যায়ে কর্মীদের অনুপস্থিতি, কাজ না করেই বেতন উত্তোলন, বদলি বাণিজ্য এবং গেইটম্যানদের কাছ থেকে মাসিক অর্থ আদায়ের অভিযোগ মিলিয়ে দপ্তরটির কার্যক্রম নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্য বলছে, দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার নজরদারিতেই যেন অনিয়মগুলো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিচ্ছে।

তথ্য অনুযায়ী, রেললাইনের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা একাধিক গ্যাং সদস্য নিয়মিত কর্মস্থলে না গিয়েও বেতন তুলছেন। অফিস নথিতে গ্যাং নং–০৭ এর চার সদস্যের প্রতিদিন সকাল সাড়ে সাতটায় ২৭৪ থেকে ২৮১ নম্বর পিলার পর্যন্ত কাজ করার কথা উল্লেখ থাকলেও এপ্রিল মাসের বিভিন্ন দিনে সরেজমিনে গিয়ে সেখানে কোনো কর্মীর উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। বিষয়টি জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা দাবি করেন দলটি নরসিংদীতে কাজ করছে। কিন্তু টাইমকিপারের বক্তব্যে উঠে আসে ভিন্ন তথ্য—তিনি জানান দলটি ভৈরবে কর্মরত। একই গ্যাংকে ঘিরে এই দ্বৈত বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও সন্দেহজনক করে তুলেছে।

গ্যাং নং–০৯ সম্পর্কেও পাওয়া গেছে একই ধরনের অসঙ্গতি। টাইমকিপারের তথ্য অনুযায়ী দলটি নীলগঞ্জ স্টেশনের ২৮৮ থেকে ২৯৪ নম্বর পিলারে কাজ করছে। কিন্তু সেখানে গিয়ে কোনো কর্মীর দেখা মেলেনি। পরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা প্রথমে দুইজন কাজ করছেন বলে দাবি করলেও পরে বলেন তারা ছুটিতে আছেন। অথচ গ্যাংটিতে আটজন সদস্য থাকার কথা। বাকিদের অবস্থান নিয়ে কোনো স্পষ্ট জবাব পাওয়া যায়নি।

অনুসন্ধানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক যে চিত্র উঠে এসেছে তা হলো বদলি বাণিজ্য। অভিযোগ রয়েছে, একাধিক কর্মী দায়িত্বে না থেকেও বেতন নিচ্ছেন এবং টাকার বিনিময়ে অন্যদের দিয়ে কাজ করাচ্ছেন। বিভিন্ন গ্যাংয়ের একাধিক সদস্যের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমনকি সরেজমিনে কথা বলা এক বদলি শ্রমিক জানান, তাকে দীর্ঘদিন ধরে অন্যের স্থলে কাজ করতে দেওয়া হয়েছে এবং এ বিষয়ে অফিস থেকেও অনুমতির কথা বলা হয়েছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি চাকরির দায়িত্ব কি ব্যক্তিগতভাবে অন্যকে দিয়ে করানো যায়?

অভিযোগ আরও রয়েছে, দায়িত্বস্থল কিশোরগঞ্জ হলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে অফিসে খুব কম দেখা যায়। অফিস সময়ের বড় অংশ তিনি অন্য জেলায় অবস্থান করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে তার বক্তব্য—কিশোরগঞ্জে সব সময় থাকা জরুরি নয়। দায়িত্বশীল পদে থাকা একজন কর্মকর্তার এমন মন্তব্য স্থানীয়দের বিস্মিত করেছে।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ এসেছে ভৈরব বাজার থেকে আঠারোবাড়ি পর্যন্ত প্রকল্পে কর্মরত ৪৮ জন গেইটম্যানকে ঘিরে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রত্যেকের কাছ থেকে মাসে এক থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়। মধ্যস্থতার মাধ্যমে এ অর্থ নিয়মিত সংগ্রহ করা হয় বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গেইটম্যান জানান, দীর্ঘ সময় ডিউটি করার শর্তে মাসিক টাকা দিতে বাধ্য করা হয়।

রেলপথের নিরাপত্তা সরাসরি জননিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। সেখানে কর্মীদের অনুপস্থিতি, বদলি দিয়ে দায়িত্ব পালন এবং বেতন উত্তোলনের অভিযোগ শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতাই নয়, সম্ভাব্য বড় ঝুঁকির ইঙ্গিতও বহন করছে। সরকারি অর্থ ব্যবহারের স্বচ্ছতা নিয়েও তৈরি হয়েছে গভীর সন্দেহ।

ধারাবাহিক এসব অভিযোগে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং দপ্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি এখন জোরালো হয়ে উঠেছে।


দৈনিক উত্তরের নিউজ

প্রকাশকঃ এম কে পুলক আহম্মেদ
Email: dainikauttareraniuja@gmail.com
web www.dainikuttarernews.com

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উত্তরের নিউজ