দৈনিক উত্তরের নিউজ
আপডেট : সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬

আজকের ‘আমি আমি’ হয়ে ওঠার পেছনে যাঁদের নিঃস্বার্থ অবদান

আজকের ‘আমি আমি’ হয়ে ওঠার পেছনে যাঁদের নিঃস্বার্থ অবদান

শিক্ষক দিবস মূলত একটি পশ্চিমা ধারণা। আমাদের প্রাচ্যে শিক্ষককে স্মরণ করার জন্য আলাদা কোনো দিনের প্রয়োজন হয় না। কারণ আমাদের জীবনে শিক্ষক শুধু পিতা-মাতার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের একজন নন, তাঁরা এমন কিছু মানুষ—যাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা সময়ের সঙ্গে আরও গভীর হয়।

কবিতায় পড়েছি, বাদশা আলমগীর তাঁর সন্তানকে শিক্ষকের পা ধুয়ে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। ছোটবেলায় হয়তো এই কথার গভীরতা পুরোপুরি বুঝিনি। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যখন নিজের জীবনের দিকে ফিরে তাকাই, তখন বুঝতে পারি—একজন শিক্ষক শুধু বইয়ের অক্ষর শেখান না; অনেক সময় তিনি একজন মানুষকে মানুষ হয়ে উঠতে শেখান।

আমার জীবনেও এমন অনেক শিক্ষক এসেছেন। তাই আজ শিক্ষক দিবসে একজনকে আলাদা করে শ্রেষ্ঠ বলার চেষ্টা করব না। কারণ আমার কাছে প্রত্যেক শিক্ষকই আলাদা একটি গল্প। কারও কাছে পেয়েছি জ্ঞানের আলো, কারও কাছে শাসন, কারও কাছে স্নেহ, কারও কাছে আত্মবিশ্বাস। আবার কেউ হয়তো খুব অল্প সময় আমার জীবনে ছিলেন, কিন্তু তাঁর বলা একটি কথাই পরবর্তীতে বহু বছর আমাকে পথ দেখিয়েছে।

ব্র্যাক স্কুলে পড়াশোনার শুরু

আমার শৈশবের কথা মনে পড়লে প্রথমেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে খানসামা উপজেলার খালেক চেয়ারম্যান পাড়া। সেখানেই ব্র্যাক স্কুলে আমার পড়াশোনার শুরু।

আমার ক্লাস টিচার ছিলেন শ্রী পারুল রায়। তখন আমি খুব ছোট। আজ এত বছর পর ফিরে তাকালে মনে হয়, আমার হাত ধরে অক্ষর শেখানোর সেই মানুষটির অবদান কতটা বড় ছিল!

বাংলা ও ইংরেজি হাতের লেখা কীভাবে সুন্দর করতে হয়, কীভাবে পড়তে হয়, কীভাবে স্পষ্ট উচ্চারণে কথা বলতে হয়—এসবের অনেক কিছুই তাঁর কাছ থেকে শেখা। সেই ছোট্ট বয়সে হয়তো বুঝিনি, একজন শিক্ষক যখন একটি শিশুর হাত ধরে অক্ষর লিখিয়ে দেন, তখন তিনি আসলে তার ভবিষ্যতের পথটাও একটু একটু করে তৈরি করে দেন।

মালোনদীর পাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

এরপর শুরু হয় মালোনদীর পাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমার পথচলা। ক্লাস ১ থেকে ৫ পর্যন্ত জীবনের প্রায় পাঁচটি বছর আমি একদল শিক্ষকের স্নেহ, শাসন ও যত্নের মধ্যে কাটিয়েছি।

জীবনের এই সময়ে একসঙ্গে কাটানো দিনগুলোর কারণে স্কুলের প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ, প্রতিটি বারান্দা এবং প্রতিটি পরিচিত মুখের সঙ্গে আজও যেন আমার শৈশবের কোনো না কোনো স্মৃতি জড়িয়ে আছে।

মোয়াজ্জেম সরকার স্যার, মিজানুর রহমান স্যার, আফরোজা ম্যাম ও আফিয়া ম্যাম—তাঁদের কথা মনে পড়লে সেই ছোটবেলার দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। তখন হয়তো তাঁদের প্রতিটি কথার গুরুত্ব বুঝতাম না। আজ বুঝি, একজন শিক্ষকের কিছু কথা ছাত্রের মনে বহু বছর পরও ফিরে আসে।

আফরোজা ম্যাম ও আফিয়া ম্যামের কাছ থেকেও পেয়েছি শিক্ষা, স্নেহ ও আপনজনের মতো ভালোবাসা। তাঁরা শুধু শিক্ষিকা ছিলেন না, আমাদের অনেক আদর ও খেয়াল রাখতেন—বিশেষ করে আমার প্রতি তাঁদের আন্তরিকতা আজও মনে পড়ে।

নিউ পাকেরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ে মাধ্যমিকের পথচলা

এরপর শুরু হয় মাধ্যমিকের অধ্যায়। খানসামার সুনামধন্য প্রতিষ্ঠান নিউ পাকেরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ে ক্লাস ৬ থেকে ১০ পর্যন্ত আমার পথচলা।

এখানেও জীবনের প্রায় পাঁচটি বছর একদল শিক্ষকের স্নেহ, শাসন ও যত্নের মধ্যে কেটেছে। এই দীর্ঘ সময়ে স্কুলের প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ, প্রতিটি বারান্দা, প্রতিটি পরিচিত মুখ এবং প্রতিটি দিনের সঙ্গে আমার জীবনের কোনো না কোনো স্মৃতি জড়িয়ে গেছে।

শেখ রফিকুল স্যার, শফিকুল স্যার, সাইফুল স্যার, হাসান স্যার, লিটন স্যার, আলি মর্তুজা স্যার, জান্নাতুন ম্যাম, আনজুআরা ম্যাম, বেলায়েত স্যার ও জয়ন্ত স্যার—তাঁদের কথা মনে পড়লেই সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে।

তখন হয়তো তাঁদের প্রতিটি কথার গুরুত্ব বুঝতাম না। আজ বুঝি, একজন শিক্ষকের বলা একটি কথা ছাত্রের মনে কতটা গভীরভাবে থেকে যেতে পারে।

বাংলা শিক্ষক মোঃ সাইফুল ইসলাম

আমার বাংলা শিক্ষক মোঃ সাইফুল ইসলাম স্যার-এর কথা আলাদা করে মনে পড়ে। তাঁর পড়ানোর মধ্যে এমন একটি আন্তরিকতা ছিল যে, মাঝে মাঝে মনে হতো—তিনি যেন ক্লাসে কোনো ছাত্রকে পড়াচ্ছেন না, নিজের সন্তানকেই পড়াচ্ছেন।

একজন শিক্ষক যখন ছাত্রকে নিজের সন্তানের মতো ভাবেন, তখন তাঁর পড়ানো বিষয় শুধু খাতার পাতায় থাকে না—মনের ভেতরেও জায়গা করে নেয়।

ইংরেজি ও আইসিটি শিক্ষা

ইংরেজির কথা মনে পড়লে মনে পড়ে মান্নান স্যার, আনজুআরা ম্যাম ও বেলায়েত স্যারের কথা। প্রত্যেকের শেখানোর ধরন ছিল আলাদা, কিন্তু উদ্দেশ্য ছিল এক—আমাদের শেখানো।

সাইফুল স্যারের কাছ থেকে আইসিটি শিখেছি। আর অঙ্কের সঙ্গে আমার যে যুদ্ধ ছিল, সেই যুদ্ধে পাশে ছিলেন জয়ন্ত স্যার, লিটন স্যার ও আলি মর্তুজা স্যার।

আজ ভাবি, তখন হয়তো একটি অঙ্ক ঠিকমতো না পারলে শুধু অঙ্কটাই কঠিন মনে হতো। কিন্তু আমাদের শিক্ষকরা জানতেন—একটি বিষয় বুঝিয়ে দেওয়া মানে শুধু সেই প্রশ্নের উত্তর শেখানো নয়; একজন ছাত্রকে সমস্যার সমাধান করতে শেখানো।

শিক্ষকদের শিক্ষা জীবনের পথচলার সঙ্গী

শিক্ষকদের কথা লিখতে গিয়ে বারবার একটি বিষয় মনে হচ্ছে—আমরা ছাত্ররা হয়তো শিক্ষকদের দেওয়া প্রতিটি জিনিস সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারি না।

একজন শিক্ষক একটি কথা বললেন, একটি ভুল ধরিয়ে দিলেন, কোনো একটি বিষয়ে শাসন করলেন কিংবা উৎসাহ দিলেন—তখন হয়তো মনে হয়েছে, এসব তো স্বাভাবিক।

কিন্তু বহু বছর পর জীবনের কোনো এক বাঁকে দাঁড়িয়ে হঠাৎ মনে হয়—

“আচ্ছা, এই কথাটাই তো সেদিন আমার শিক্ষক বলেছিলেন!”

তখন বুঝি, শিক্ষক আসলে কতটা গভীরভাবে আমাদের জীবনের ভেতরে থেকে যান।

আজ এতগুলো নাম একসঙ্গে মনে করলে বুঝতে পারি, প্রত্যেকের সঙ্গে আমার আলাদা একটি গল্প আছে। কেউ আমাকে বই পড়তে শিখিয়েছেন, কেউ সুন্দর করে লিখতে, কেউ স্পষ্ট করে কথা বলতে, কেউ ধর্মের সৌন্দর্য ও উদারতা বুঝতে, আবার কেউ কঠিন বিষয় সহজ করে বুঝতে শিখিয়েছেন।

কেউ ভুল করলে আবার চেষ্টা করতে শিখিয়েছেন। আবার কেউ হয়তো শুধু একটি ভালো কথা বলেছেন—যেটা কোনো একসময় আমার ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তাই কাউকে আলাদা করে বড়, কাউকে ছোট করার সুযোগ আমার নেই। আমার জীবনের শিক্ষকরা সংখ্যায় অনেক, কিন্তু তাঁদের প্রত্যেকের জায়গা আমার হৃদয়ে আলাদা।

জীবনের প্রতিটি শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরেও আমার জীবনে অনেক মানুষ এসেছেন, যাঁদের কাছ থেকে শিখেছি। তাঁদের কেউ আমাকে বইয়ের বাইরে জীবন পড়তে শিখিয়েছেন, কেউ ধৈর্য ধরতে, কেউ মানুষের কথা শুনতে, আবার কেউ সহনশীল হতে শিখিয়েছেন।

আজ বুঝি, শিক্ষক শুধু সেই মানুষ নন, যিনি একটি শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে পড়ান। জীবনের কোনো একটি মুহূর্তে যে মানুষটি আমাদের অন্ধকার থেকে আলো দেখান, ভুল থেকে সঠিকের দিকে ফিরিয়ে দেন কিংবা নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে আমাদের একটি পথ দেখান—তিনিও এক অর্থে আমাদের শিক্ষক।

তাই শিক্ষক দিবসে আমার শ্রদ্ধা শুধু স্কুল, কলেজ বা মাদ্রাসার শিক্ষকদের জন্য নয়। আমার জীবনে যাঁরা কোনো না কোনোভাবে আমাকে শিখিয়েছেন, তাঁদের সবার জন্য।

আমি আজ যা কিছু ভালো করতে পারি, যা কিছু সুন্দরভাবে ভাবতে পারি, মানুষের প্রতি যতটুকু শ্রদ্ধা রাখতে শিখেছি, ভুল থেকে যতটুকু ফিরে আসতে শিখেছি—এসবের কোনোটিই আমার একার অর্জন নয়।

এর পেছনে আমার বাবা-মা, পরিবার এবং আমার শিক্ষকদের অবদান সবচেয়ে বেশি। আমার মধ্যে আপনারা যতটুকু ভালো দেখেন, তার বড় একটি অংশ আসলে তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া।

আজ তাঁদের অনেকেই হয়তো জানেন না, তাঁদের বলা কোনো একটি কথা আমি আজও মনে রেখেছি। কোনো কোনো শিক্ষক হয়তো জানেনই না, তাঁর দেওয়া শিক্ষা আমার জীবনের কোনো এক কঠিন সময়ে আমাকে সাহস দিয়েছে।

তাঁদের সবাইকে হয়তো আলাদা করে গিয়ে বলা হয়নি—

“স্যার, আপনার কাছে আমি কৃতজ্ঞ।” “ম্যাডাম, আপনার শেখানো কথাটি আমি আজও মনে রেখেছি।”

তাই আজ এই লেখার মাধ্যমে তাঁদের সবাইকে একসঙ্গে বলতে চাই—

আপনারা হয়তো আমাকে পড়িয়েছেন কয়েকটি বছর, কিন্তু আপনাদের শিক্ষা আমি বহন করছি সারাজীবন।

আপনারা আমার শুধু শিক্ষক নন; আপনারা আমার শৈশবের স্মৃতি, আমার বেড়ে ওঠার গল্প এবং আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আমার জীবনের সকল শিক্ষকের প্রতি রইল অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা।

শুভ শিক্ষক দিবস। 

লেখক: মো: রাশেদুল ইসলাম গণমাধ্যমকর্মী

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক উত্তরের নিউজ

সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬


আজকের ‘আমি আমি’ হয়ে ওঠার পেছনে যাঁদের নিঃস্বার্থ অবদান

প্রকাশের তারিখ : ০৫ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

শিক্ষক দিবস মূলত একটি পশ্চিমা ধারণা। আমাদের প্রাচ্যে শিক্ষককে স্মরণ করার জন্য আলাদা কোনো দিনের প্রয়োজন হয় না। কারণ আমাদের জীবনে শিক্ষক শুধু পিতা-মাতার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের একজন নন, তাঁরা এমন কিছু মানুষ—যাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা সময়ের সঙ্গে আরও গভীর হয়।

কবিতায় পড়েছি, বাদশা আলমগীর তাঁর সন্তানকে শিক্ষকের পা ধুয়ে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। ছোটবেলায় হয়তো এই কথার গভীরতা পুরোপুরি বুঝিনি। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যখন নিজের জীবনের দিকে ফিরে তাকাই, তখন বুঝতে পারি—একজন শিক্ষক শুধু বইয়ের অক্ষর শেখান না; অনেক সময় তিনি একজন মানুষকে মানুষ হয়ে উঠতে শেখান।

আমার জীবনেও এমন অনেক শিক্ষক এসেছেন। তাই আজ শিক্ষক দিবসে একজনকে আলাদা করে শ্রেষ্ঠ বলার চেষ্টা করব না। কারণ আমার কাছে প্রত্যেক শিক্ষকই আলাদা একটি গল্প। কারও কাছে পেয়েছি জ্ঞানের আলো, কারও কাছে শাসন, কারও কাছে স্নেহ, কারও কাছে আত্মবিশ্বাস। আবার কেউ হয়তো খুব অল্প সময় আমার জীবনে ছিলেন, কিন্তু তাঁর বলা একটি কথাই পরবর্তীতে বহু বছর আমাকে পথ দেখিয়েছে।

ব্র্যাক স্কুলে পড়াশোনার শুরু

আমার শৈশবের কথা মনে পড়লে প্রথমেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে খানসামা উপজেলার খালেক চেয়ারম্যান পাড়া। সেখানেই ব্র্যাক স্কুলে আমার পড়াশোনার শুরু।

আমার ক্লাস টিচার ছিলেন শ্রী পারুল রায়। তখন আমি খুব ছোট। আজ এত বছর পর ফিরে তাকালে মনে হয়, আমার হাত ধরে অক্ষর শেখানোর সেই মানুষটির অবদান কতটা বড় ছিল!

বাংলা ও ইংরেজি হাতের লেখা কীভাবে সুন্দর করতে হয়, কীভাবে পড়তে হয়, কীভাবে স্পষ্ট উচ্চারণে কথা বলতে হয়—এসবের অনেক কিছুই তাঁর কাছ থেকে শেখা। সেই ছোট্ট বয়সে হয়তো বুঝিনি, একজন শিক্ষক যখন একটি শিশুর হাত ধরে অক্ষর লিখিয়ে দেন, তখন তিনি আসলে তার ভবিষ্যতের পথটাও একটু একটু করে তৈরি করে দেন।

মালোনদীর পাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

এরপর শুরু হয় মালোনদীর পাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমার পথচলা। ক্লাস ১ থেকে ৫ পর্যন্ত জীবনের প্রায় পাঁচটি বছর আমি একদল শিক্ষকের স্নেহ, শাসন ও যত্নের মধ্যে কাটিয়েছি।

জীবনের এই সময়ে একসঙ্গে কাটানো দিনগুলোর কারণে স্কুলের প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ, প্রতিটি বারান্দা এবং প্রতিটি পরিচিত মুখের সঙ্গে আজও যেন আমার শৈশবের কোনো না কোনো স্মৃতি জড়িয়ে আছে।

মোয়াজ্জেম সরকার স্যার, মিজানুর রহমান স্যার, আফরোজা ম্যাম ও আফিয়া ম্যাম—তাঁদের কথা মনে পড়লে সেই ছোটবেলার দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। তখন হয়তো তাঁদের প্রতিটি কথার গুরুত্ব বুঝতাম না। আজ বুঝি, একজন শিক্ষকের কিছু কথা ছাত্রের মনে বহু বছর পরও ফিরে আসে।

আফরোজা ম্যাম ও আফিয়া ম্যামের কাছ থেকেও পেয়েছি শিক্ষা, স্নেহ ও আপনজনের মতো ভালোবাসা। তাঁরা শুধু শিক্ষিকা ছিলেন না, আমাদের অনেক আদর ও খেয়াল রাখতেন—বিশেষ করে আমার প্রতি তাঁদের আন্তরিকতা আজও মনে পড়ে।

নিউ পাকেরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ে মাধ্যমিকের পথচলা

এরপর শুরু হয় মাধ্যমিকের অধ্যায়। খানসামার সুনামধন্য প্রতিষ্ঠান নিউ পাকেরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ে ক্লাস ৬ থেকে ১০ পর্যন্ত আমার পথচলা।

এখানেও জীবনের প্রায় পাঁচটি বছর একদল শিক্ষকের স্নেহ, শাসন ও যত্নের মধ্যে কেটেছে। এই দীর্ঘ সময়ে স্কুলের প্রতিটি শ্রেণিকক্ষ, প্রতিটি বারান্দা, প্রতিটি পরিচিত মুখ এবং প্রতিটি দিনের সঙ্গে আমার জীবনের কোনো না কোনো স্মৃতি জড়িয়ে গেছে।

শেখ রফিকুল স্যার, শফিকুল স্যার, সাইফুল স্যার, হাসান স্যার, লিটন স্যার, আলি মর্তুজা স্যার, জান্নাতুন ম্যাম, আনজুআরা ম্যাম, বেলায়েত স্যার ও জয়ন্ত স্যার—তাঁদের কথা মনে পড়লেই সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে।

তখন হয়তো তাঁদের প্রতিটি কথার গুরুত্ব বুঝতাম না। আজ বুঝি, একজন শিক্ষকের বলা একটি কথা ছাত্রের মনে কতটা গভীরভাবে থেকে যেতে পারে।

বাংলা শিক্ষক মোঃ সাইফুল ইসলাম

আমার বাংলা শিক্ষক মোঃ সাইফুল ইসলাম স্যার-এর কথা আলাদা করে মনে পড়ে। তাঁর পড়ানোর মধ্যে এমন একটি আন্তরিকতা ছিল যে, মাঝে মাঝে মনে হতো—তিনি যেন ক্লাসে কোনো ছাত্রকে পড়াচ্ছেন না, নিজের সন্তানকেই পড়াচ্ছেন।

একজন শিক্ষক যখন ছাত্রকে নিজের সন্তানের মতো ভাবেন, তখন তাঁর পড়ানো বিষয় শুধু খাতার পাতায় থাকে না—মনের ভেতরেও জায়গা করে নেয়।

ইংরেজি ও আইসিটি শিক্ষা

ইংরেজির কথা মনে পড়লে মনে পড়ে মান্নান স্যার, আনজুআরা ম্যাম ও বেলায়েত স্যারের কথা। প্রত্যেকের শেখানোর ধরন ছিল আলাদা, কিন্তু উদ্দেশ্য ছিল এক—আমাদের শেখানো।

সাইফুল স্যারের কাছ থেকে আইসিটি শিখেছি। আর অঙ্কের সঙ্গে আমার যে যুদ্ধ ছিল, সেই যুদ্ধে পাশে ছিলেন জয়ন্ত স্যার, লিটন স্যার ও আলি মর্তুজা স্যার।

আজ ভাবি, তখন হয়তো একটি অঙ্ক ঠিকমতো না পারলে শুধু অঙ্কটাই কঠিন মনে হতো। কিন্তু আমাদের শিক্ষকরা জানতেন—একটি বিষয় বুঝিয়ে দেওয়া মানে শুধু সেই প্রশ্নের উত্তর শেখানো নয়; একজন ছাত্রকে সমস্যার সমাধান করতে শেখানো।

শিক্ষকদের শিক্ষা জীবনের পথচলার সঙ্গী

শিক্ষকদের কথা লিখতে গিয়ে বারবার একটি বিষয় মনে হচ্ছে—আমরা ছাত্ররা হয়তো শিক্ষকদের দেওয়া প্রতিটি জিনিস সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারি না।

একজন শিক্ষক একটি কথা বললেন, একটি ভুল ধরিয়ে দিলেন, কোনো একটি বিষয়ে শাসন করলেন কিংবা উৎসাহ দিলেন—তখন হয়তো মনে হয়েছে, এসব তো স্বাভাবিক।

কিন্তু বহু বছর পর জীবনের কোনো এক বাঁকে দাঁড়িয়ে হঠাৎ মনে হয়—

“আচ্ছা, এই কথাটাই তো সেদিন আমার শিক্ষক বলেছিলেন!”

তখন বুঝি, শিক্ষক আসলে কতটা গভীরভাবে আমাদের জীবনের ভেতরে থেকে যান।

আজ এতগুলো নাম একসঙ্গে মনে করলে বুঝতে পারি, প্রত্যেকের সঙ্গে আমার আলাদা একটি গল্প আছে। কেউ আমাকে বই পড়তে শিখিয়েছেন, কেউ সুন্দর করে লিখতে, কেউ স্পষ্ট করে কথা বলতে, কেউ ধর্মের সৌন্দর্য ও উদারতা বুঝতে, আবার কেউ কঠিন বিষয় সহজ করে বুঝতে শিখিয়েছেন।

কেউ ভুল করলে আবার চেষ্টা করতে শিখিয়েছেন। আবার কেউ হয়তো শুধু একটি ভালো কথা বলেছেন—যেটা কোনো একসময় আমার ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তাই কাউকে আলাদা করে বড়, কাউকে ছোট করার সুযোগ আমার নেই। আমার জীবনের শিক্ষকরা সংখ্যায় অনেক, কিন্তু তাঁদের প্রত্যেকের জায়গা আমার হৃদয়ে আলাদা।

জীবনের প্রতিটি শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরেও আমার জীবনে অনেক মানুষ এসেছেন, যাঁদের কাছ থেকে শিখেছি। তাঁদের কেউ আমাকে বইয়ের বাইরে জীবন পড়তে শিখিয়েছেন, কেউ ধৈর্য ধরতে, কেউ মানুষের কথা শুনতে, আবার কেউ সহনশীল হতে শিখিয়েছেন।

আজ বুঝি, শিক্ষক শুধু সেই মানুষ নন, যিনি একটি শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে পড়ান। জীবনের কোনো একটি মুহূর্তে যে মানুষটি আমাদের অন্ধকার থেকে আলো দেখান, ভুল থেকে সঠিকের দিকে ফিরিয়ে দেন কিংবা নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে আমাদের একটি পথ দেখান—তিনিও এক অর্থে আমাদের শিক্ষক।

তাই শিক্ষক দিবসে আমার শ্রদ্ধা শুধু স্কুল, কলেজ বা মাদ্রাসার শিক্ষকদের জন্য নয়। আমার জীবনে যাঁরা কোনো না কোনোভাবে আমাকে শিখিয়েছেন, তাঁদের সবার জন্য।

আমি আজ যা কিছু ভালো করতে পারি, যা কিছু সুন্দরভাবে ভাবতে পারি, মানুষের প্রতি যতটুকু শ্রদ্ধা রাখতে শিখেছি, ভুল থেকে যতটুকু ফিরে আসতে শিখেছি—এসবের কোনোটিই আমার একার অর্জন নয়।

এর পেছনে আমার বাবা-মা, পরিবার এবং আমার শিক্ষকদের অবদান সবচেয়ে বেশি। আমার মধ্যে আপনারা যতটুকু ভালো দেখেন, তার বড় একটি অংশ আসলে তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া।

আজ তাঁদের অনেকেই হয়তো জানেন না, তাঁদের বলা কোনো একটি কথা আমি আজও মনে রেখেছি। কোনো কোনো শিক্ষক হয়তো জানেনই না, তাঁর দেওয়া শিক্ষা আমার জীবনের কোনো এক কঠিন সময়ে আমাকে সাহস দিয়েছে।

তাঁদের সবাইকে হয়তো আলাদা করে গিয়ে বলা হয়নি—

“স্যার, আপনার কাছে আমি কৃতজ্ঞ।” “ম্যাডাম, আপনার শেখানো কথাটি আমি আজও মনে রেখেছি।”

তাই আজ এই লেখার মাধ্যমে তাঁদের সবাইকে একসঙ্গে বলতে চাই—

আপনারা হয়তো আমাকে পড়িয়েছেন কয়েকটি বছর, কিন্তু আপনাদের শিক্ষা আমি বহন করছি সারাজীবন।

আপনারা আমার শুধু শিক্ষক নন; আপনারা আমার শৈশবের স্মৃতি, আমার বেড়ে ওঠার গল্প এবং আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

আমার জীবনের সকল শিক্ষকের প্রতি রইল অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা।

শুভ শিক্ষক দিবস। 

লেখক: মো: রাশেদুল ইসলাম গণমাধ্যমকর্মী


দৈনিক উত্তরের নিউজ

সম্পাদকঃ নুর আমিন
সহ-সম্পাদকঃ আরকে. রাসেদ খান
প্রকাশকঃ এম কে পুলক আহম্মেদ
Email: dainikauttareraniuja@gmail.com
web www.dainikuttarernews.com

কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উত্তরের নিউজ