বিয়ে ছাড়াই জীবন সুন্দর! অবিবাহিতদের বিশেষ দিন আজ
নিজের মতো জীবন, নিজের সিদ্ধান্ত—অবিবাহিত জীবন উদ্যাপনের দিন আজবিয়ে করেননি? তাই বলে মন খারাপ করার কিছু নেই। বরং নিজের মতো করে জীবন কাটানো, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়া এবং ‘কবে বিয়ে করছেন?’—এই চিরচেনা প্রশ্নটি কিছুটা পাশ কাটিয়ে যাওয়ার উপলক্ষ হতে পারে আজকের দিনটি। আজ অবিবাহিত দিবস।একসময় অবিবাহিত থাকাকে সমাজের চোখে সমস্যা তো বটেই, কখনও কখনও অভিশাপ হিসেবেও দেখা হতো। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে সামাজিক চাপ ছিল আরও বেশি। তবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে সেই ধারণা। বর্তমানে অনেক নারী-পুরুষ নিজের ইচ্ছায় অবিবাহিত জীবন বেছে নিচ্ছেন এবং এই জীবনের স্বাধীনতা, স্বাচ্ছন্দ্য ও নানা সুবিধা উপভোগ করছেন।অবিবাহিত মানেই ‘কেউ পেল না’—এমন ধারণাও এখন অনেকটাই সেকেলে। কেউ হয়তো সঙ্গী খুঁজছেন না, কেউ নিজের ক্যারিয়ার ও স্বপ্ন নিয়ে ব্যস্ত, আবার কেউ নিজের একার সঙ্গেই সুখে আছেন। কারণ সুখী থাকার জন্য বিয়ের সনদ বাধ্যতামূলক—এমন কোনো নিয়ম নেই।অবিবাহিত দিবসের শুরু যেভাবেঅবিবাহিত জীবন উদ্যাপনের উদ্যোগ অবশ্য খুব পুরোনো নয়। প্রায় চার দশক আগে একদল মানুষ নিজেদের অবিবাহিত জীবনকে উদ্যাপন করার উদ্যোগ নেন। ভালোবাসা ও বিবাহকে ঘিরে যখন একের পর এক দিবস পালিত হচ্ছিল, তখন অবিবাহিতদের জন্যও একটি দিন থাকা প্রয়োজন—এমন ভাবনা থেকেই ১৯৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের বাকআই সিঙ্গেলস কাউন্সিল জাতীয় অবিবাহিত সপ্তাহ চালু করে।পরে ২০১৪ সালে কারেন রিডের উদ্যোগে ১১ জানুয়ারি জাতীয় অবিবাহিত দিবস চালু হয়। ১/১১-এর সংখ্যাগত বিন্যাসকে অবিবাহিত জীবনের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করেই এই তারিখ বেছে নেওয়া হয়েছিল।২০১৭ সালে জাতীয় অবিবাহিত দিবসের উদ্যোক্তারা জাতীয় অবিবাহিত সপ্তাহের সঙ্গে একত্র হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর সেপ্টেম্বরের তৃতীয় পূর্ণ সপ্তাহে অবিবাহিত সপ্তাহ এবং সেই সপ্তাহের শেষ শনিবারে জাতীয় অবিবাহিত দিবস উদ্যাপন করা হয়।ইতিহাসের পাতায় অবিবাহিত জীবনঅবিবাহিত থাকা নিয়ে সামাজিক ধারণা বদলের ইতিহাসও একেবারে নতুন নয়। ১৫৫৮ সালে ইংল্যান্ডের সিংহাসনে বসা প্রথম এলিজাবেথ বিয়ের জন্য নিয়মিত সামাজিক চাপের মুখে পড়লেও শেষ পর্যন্ত অবিবাহিত থাকার সিদ্ধান্ত নেন। প্রায় ৪৫ বছরের শাসনামলে তিনি নিজের ক্ষমতা ও স্বাধীনতা ধরে রাখেন।১৯১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নারীদের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা নারীর স্বাধীনতার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। এরপর ১৯৮০-এর দশকে শুরু হয় জাতীয় অবিবাহিত সপ্তাহ। পরে ১৯৯০-এর দশকে চীনের নানজিংয়ের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১১ নভেম্বরকে অবিবাহিতদের উদ্যাপনের দিন হিসেবে পালনের চল শুরু হয়।১৯৯২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘সিঙ্গেলস’ সিনেমাতেও অবিবাহিত তরুণ-তরুণীদের প্রেম, জীবন ও সাফল্যের গল্প উঠে আসে।একা থাকার সুবিধাও কম নয়অবিবাহিত জীবন নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় এর কিছু ইতিবাচক দিকের কথাও উঠে এসেছে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, সম্পর্কে থাকা মানুষের তুলনায় অবিবাহিত ব্যক্তিরা অনেক ক্ষেত্রে বেশি শরীরচর্চা করেন এবং শারীরিকভাবে সুস্থ থাকেন।পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রেও অবিবাহিতদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বয়স্ক বাবা-মা কিংবা প্রয়োজনের সময় পরিবারের সদস্যদের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ তাদের বেশি থাকতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে বন্ধুত্বও দীর্ঘস্থায়ী হয়।ঘুমের ক্ষেত্রেও একা থাকার সুবিধা রয়েছে। সঙ্গীর নাক ডাকার কারণে রাতের ঘুম নষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি এড়ানো যায়। কিছু গবেষণায় একা ঘুমালে তুলনামূলকভাবে ভালো ঘুমের সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে।আর্থিক দিক থেকেও অবিবাহিত জীবনের কিছু সুবিধা থাকতে পারে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বিবাহিত ব্যক্তি ও সন্তান থাকা ব্যক্তিদের অনিরাপদ ঋণ থাকার সম্ভাবনা বেশি। পরিবেশের ক্ষেত্রেও অবিবাহিত জীবনযাপন তুলনামূলকভাবে টেকসই হতে পারে বলে কিছু গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া যায়।বন্ধুদের নিয়ে হোক উদ্যাপনঅবিবাহিত দিবসে প্রেমের জোড়ার পরিবর্তে বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো হতে পারে আনন্দের একটি উপলক্ষ। কাছের বন্ধুদের নিয়ে রাতের খাবার, আড্ডা কিংবা এক কাপ কফির আয়োজন হতে পারে চমৎকার উদ্যাপন।সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—কোথায় যাবেন, কখন ফিরবেন কিংবা কার সঙ্গে দেখা করবেন, তার জন্য ‘অনুমোদন বোর্ডে’ আবেদন করার প্রয়োজন নেই। তবে বন্ধুরা যেন আবার আপনাকে বিয়ের পাত্র বা পাত্রী খোঁজার দায়িত্ব দিয়ে না বসেন, সেদিকেও নজর রাখা ভালো।অবিবাহিত মানুষের সংখ্যাও কম নয়২০২৩ সালের হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রে ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী ১২ কোটি ৭০ লাখেরও বেশি অবিবাহিত প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ছিলেন। তাদের মধ্যে ৫৩ শতাংশ নারী এবং ৪৭ শতাংশ পুরুষ।এই অবিবাহিত মানুষের ৫৬ শতাংশেরও বেশি জানিয়েছেন, তারা অগত্যা প্রেমের সম্পর্ক বা জীবনসঙ্গী খুঁজছেন না। অর্থাৎ অবিবাহিত সবাই যে ‘কাউকে খুঁজছি’ অবস্থায় আছেন, বিষয়টি এমন নয়।যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ অঙ্গরাজ্যে অবিবাহিত নারীদের নিজের বাড়ির মালিক হওয়ার হারও অবিবাহিত পুরুষদের তুলনায় বেশি। কিছু বিশেষজ্ঞের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সহস্রাব্দ প্রজন্মের প্রায় ২৫ শতাংশ মানুষ কখনো বিয়ে নাও করতে পারেন।একাই ঘুরতে বেরিয়ে পড়ুনঅনেকদিনের ভ্রমণের ইচ্ছা থাকলে অবিবাহিত দিবস হতে পারে সেই পরিকল্পনা শুরু করার একটি উপলক্ষ। কাছের কোনো জাদুঘর ঘুরে দেখা থেকে শুরু করে একা পাহাড়ে হাঁটা—নিজের পছন্দের কিছুই বাদ দেওয়ার দরকার নেই। সামর্থ্য থাকলে ইউরোপ ভ্রমণ কিংবা অস্ট্রেলিয়ায় ক্যাঙ্গারু দেখার স্বপ্নও রাখা যেতে পারে।তবে একা ভ্রমণে অভ্যস্ত না হলে অভিজ্ঞ কোনো ভ্রমণসঙ্গী কিংবা দলীয় ভ্রমণ বেছে নেওয়া যেতে পারে। নিজের পছন্দের জায়গায় নিজের মতো করে ঘুরে বেড়ানোর আনন্দও কম নয়।একা নন, সমাজের সঙ্গেও আছেনঅবিবাহিত থাকা মানেই একা থাকা নয়। জাতীয় অবিবাহিত দিবসে নিজের সময় অন্যের জন্যও কাজে লাগানো যায়। স্থানীয় কোনো দাতব্য প্রতিষ্ঠানে স্বেচ্ছাসেবী হওয়া, প্রবীণ নিবাসে গিয়ে বই পড়ে শোনানো কিংবা গাছ লাগানোর মতো সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া যেতে পারে।কারণ জীবনসঙ্গী না থাকলেও সঙ্গ দেওয়ার মতো মানুষ, ভালোবাসার মতো মানুষ এবং সমাজের জন্য করার মতো অনেক কিছুই থাকে।নিজের মতো থাকাই আসলবিয়ে করেছেন কি করেননি, সেটি জীবনের একটি সিদ্ধান্ত। কিন্তু নিজের জীবন নিয়ে ভালো থাকা, নিজের স্বপ্নকে গুরুত্ব দেওয়া এবং নিজের পছন্দকে সম্মান করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।তাই অবিবাহিত দিবসের বার্তাটি হতে পারে খুব সহজ—‘একা আছি, তাই বলে একা নই; নিজের মতো আছি, বেশ আছি।’