প্রিন্ট এর তারিখ : ১৩ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৩ অক্টোবর ২০২৬
নকলের থাবা এবার পাঠ্যবইয়ে, চাহিদার পেছনে কী কারণ?
অনলাইন ডেক্স ||
বইয়ের দোকানে একই নাম ও প্রচ্ছদের দুটি বই। একটির দাম বেশি, অন্যটির তুলনামূলক কম। কম দামের বইটি অনেক ক্ষেত্রে নকল। কেউ জেনেশুনে কিনছেন, কেউ আবার আসল ভেবেই নকল বই কিনছেন। জনপ্রিয় সৃজনশীল বইয়ের পাশাপাশি নকল হচ্ছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) পাঠ্যবইও। কম দাম, সহজলভ্যতা ও বিক্রেতাদের বাড়তি মুনাফার সুযোগ নকল বইয়ের চাহিদার পেছনে কাজ করছে বলে মনে করছেন প্রকাশক ও সংশ্লিষ্টরা।তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মূল বই প্রকাশে বিনিয়োগ, লেখকের রয়্যালটি ও অন্যান্য ব্যয় থাকলেও নকল বই তৈরিতে এসব খরচ এড়ানো যায়। ফলে নকল বই বিক্রি করে বেশি কমিশন পান বিক্রেতারা। অন্যদিকে, মূল বইয়ের দাম বেশি হওয়া, প্রয়োজনের সময় বই না পাওয়া কিংবা দ্বিতীয় সেটের প্রয়োজনেও অনেকে নকল বই কিনছেন।কম দাম ও বাড়তি কমিশনে নকল বইয়ের বিক্রিনীলক্ষেতের স্কুল-কলেজ লাইব্রেরির স্বত্বাধিকারী জিয়াউর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মূল বইয়ের সেটের মধ্যে দুই-তিনটি নকল বই মিশিয়ে বিক্রি করলে দোকানিদের লাভ বেশি হয়। মূল বই বিক্রিতে যেখানে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কমিশন পাওয়া যায়, সেখানে নকল বইয়ের ক্ষেত্রে ক্রেতাকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দিয়েও বিক্রেতার লাভ থাকে। এতে ক্রেতা কম দামে বই কেনার সুযোগ পান, আর বিক্রেতারও বিক্রি বাড়ে।তিনি বলেন, অনেক ক্রেতা বইটি নকল জেনেও কেনেন। তাদের কাছে বইয়ের বিষয়বস্তু মূল বইয়ের মতো হলেই চলে। কম দামে বই পাওয়ায় তারা মূল প্রকাশকের বই কেনার বিষয়ে সব সময় গুরুত্ব দেন না।পুঁথিনিলয় প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী শ্যামল পালও মনে করেন, নকল বই বিক্রির পেছনে বেশি লাভের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, উচ্চ মাধ্যমিকের অনুমোদিত পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি জনপ্রিয় সৃজনশীল বইও নকল হচ্ছে। এসব বইয়ের উৎপাদন খরচ কম। কারণ, লেখককে রয়্যালটি দিতে হয় না। মূল প্রকাশনার মতো বিনিয়োগ ও অন্যান্য ব্যয়ও বহন করতে হয় না।শ্যামল পাল বলেন, মূল প্রকাশকের একটি বই বিক্রি করে দোকানি যেখানে ১০ টাকা কমিশন পান, সেখানে নকল বই বিক্রি করে ২০০ টাকা পর্যন্ত কমিশন পেতে পারেন। ফলে বেশি লাভের আশায় কিছু বিক্রেতা নকল বই বিক্রিতে আগ্রহী হন।আর্থিক সামর্থ্য ও সহজলভ্যতার সংকটবেসরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম খান বলেন, নকল বই কেনার ক্ষেত্রে আর্থিক সামর্থ্য বড় বিষয়। অনেকে না জেনেই নকল বই কেনেন। আবার উচ্চ মাধ্যমিকের কিছু শিক্ষার্থী জেনেশুনে নকল বই কেনেন। কারণ, মূল বইয়ের দাম বেশি হলেও নকল বইয়ে একই পাঠ্যবিষয় পাওয়া যায়। সহজলভ্যতার কারণেও কেউ কেউ নকল বই কিনতে বাধ্য হন।তিনি বলেন, নকল বইয়ের কাগজ ও ছাপার মান অনেক সময় ভালো থাকে না। ফলে বই দ্রুত নষ্ট হয়ে যেতে পারে এবং একই বই আবার কিনতে হয়। অন্যদিকে, সৃজনশীল বইয়ের সচেতন পাঠকেরাও অনেক সময় মূল বই না পেয়ে নকল সংস্করণ কিনতে বাধ্য হন। এতে বৈধ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের কঠোর নজরদারি, নিয়মিত অভিযান ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন অধ্যাপক নজরুল ইসলাম খান।বিনামূল্যের পাঠ্যবইও কেন নকল হয়?প্রাক্-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের এনসিটিবি নির্ধারিত পাঠ্যবই বিনামূল্যে দেওয়া হয়। তারপরও এসব বইয়ের নকল সংস্করণ বাজারে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের বই সারা বছর ব্যবহারে নষ্ট হয়ে যাওয়া কিংবা দ্বিতীয় সেটের প্রয়োজন এর একটি কারণ হতে পারে।সাবেক অধ্যক্ষ, শিক্ষাবিদ, শিশুসাহিত্যিক ও শিক্ষা বিষয়ক নিবন্ধকার মো. রহমত উল্লাহ্ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, শিশু শিক্ষার্থীরা সারা বছর স্কুল, কোচিং ও প্রাইভেট শিক্ষকের কাছে বই বহন করে। এতে বই নষ্ট হয়। গ্রামাঞ্চলে বৃষ্টিতে ভিজেও বই ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ছুটিতে বাড়ি যাতায়াতের সময় দ্বিতীয় সেট বইয়ের প্রয়োজন হতে পারে।তার মতে, পাঠ্যবইয়ের কাগজ ও বাঁধাইয়ের মান উন্নত না হওয়ায় অনেক বই দ্রুত নষ্ট হয়। কিন্তু প্রয়োজন হলেও শিক্ষার্থীরা সব সময় আবার মূল বই সংগ্রহ করতে পারে না। ফলে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে বাজার থেকে বই কিনতে হয়। কম দামে নকল বই পাওয়া গেলে সেটি অনেকের কাছে বিকল্প হয়ে ওঠে।তবে সরকারি পাঠ্যবইয়ের অবৈধ মুদ্রণ ও বিক্রি বন্ধে নজরদারি জরুরি বলে মনে করেন রহমত উল্লাহ্। পাশাপাশি প্রয়োজনের সময় শিক্ষার্থীরা যেন মূল বই পায়, তা নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেন তিনি।কপিরাইট সুরক্ষা ও সাশ্রয়ী বইয়ের ব্যবস্থাকবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও অধ্যাপক ড. শোয়াইব জিবরান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, নকল বই বিক্রি অন্যায়। পাঠক কম দামে ও সহজে পাওয়া যায় এমন বই কিনতে চাইতে পারেন। যেসব প্রতিষ্ঠান বই প্রকাশের অনুমোদন পেয়েছে, শিক্ষার্থীদের কাছে বই পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বও তাদের। প্রয়োজনে প্রকাশকদের আইনের আশ্রয় নেওয়া উচিত।তিনি বলেন, অনেকে না জেনেই নকল বই কেনেন। আবার মূল বই না পেয়ে বা বেশি দামের কারণে কেউ কেউ নকল বই কিনতে বাধ্য হন। এ ক্ষেত্রে কপিরাইটের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বাংলা একাডেমি প্রয়োজনীয় বইয়ের স্বত্ব কিনে কম দামে প্রকাশ ও বাজারজাত করতে পারে। তবে নকল বই বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন।পুঁথিনিলয় প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী শ্যামল পালও নকল বইয়ের ব্যবসায়ীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার পক্ষে। তবে সরকার যেন বেসরকারি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকল্প হয়ে পুরো প্রকাশনা বাজারের দায়িত্ব না নেয়, সেদিকেও নজর দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। এতে বেসরকারি প্রকাশনায় বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে মনে করেন শ্যামল পাল। তার মতে, জনস্বার্থে সাশ্রয়ী বইয়ের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি প্রকাশনা শিল্পের স্বার্থও রক্ষা করতে হবে।সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নকল বইয়ের চাহিদা কমাতে শুধু অভিযান যথেষ্ট নয়। বৈধ বইয়ের সহজলভ্যতা বাড়ানো, পাঠ্যবইয়ের মান উন্নত করা, সাশ্রয়ী মূল্যে বই প্রকাশ এবং কপিরাইট আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। পাঠক যেন কম দামে বৈধ বই পান, আবার লেখক ও প্রকাশকরাও তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করাই এ ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ।
সম্পাদকঃ নুর-আমিন
সহ-সম্পাদকঃ আরকে. রাসেদ খান
প্রকাশকঃ এম কে পুলক আহম্মেদ
E-mail: dainikauttareraniuja@gmail.com
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উত্তরের নিউজ