প্রিন্ট এর তারিখ : ০৯ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৮ অক্টোবর ২০২৬
ছিনতাই রুখতে এবার মাঠে তরুণদের বাহিনী, থাকছে নিজস্ব ইউনিফর্ম
নিজস্ব প্রতিনিধি ||
গাজীপুরের টঙ্গীতে ছিনতাই, মাদক সেবন ও মাদকব্যবসার মতো অপরাধ দমনে নিজেদের উদ্যোগে মাঠে নেমেছে একদল তরুণ। ‘বাংলাদেশ ইয়ুথ রেভল্যুশন’ নামে সংগঠনটির সদস্যরা নির্দিষ্ট পোশাক পরে এলাকায় টহল দেন, বিভিন্ন অভিযানে অংশ নেন এবং সন্দেহভাজনদের আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। তবে তাদের এমন কর্মকাণ্ড নিয়ে আইন হাতে তুলে নেওয়া এবং নিরীহ মানুষ হয়রানির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।গত ১৬ আগস্ট টঙ্গীতে এক ব্যক্তিকে কয়েকজন তরুণের আটকের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে আটক ব্যক্তি নিজেকে আনোয়ার ওরফে ‘ব্লেড আনোয়ার’ বলে পরিচয় দেন। তরুণেরা তাকে টঙ্গীর ছিনতাইকারীদের উদ্দেশে সতর্কবার্তা দিতে বলেন। একপর্যায়ে আনোয়ার বলেন, টঙ্গীতে কেউ ছিনতাই করতে এলে ‘পাবলিক’ তাকে মারধর করবে।ভিডিওতে পরে তরুণেরা তাকে ‘বাংলাদেশ ইয়ুথ রেভল্যুশন’ সংগঠনের নাম বলতে বলেন। এরপরই ভিডিওটির সমাপ্তি ঘটে।সংগঠনটির কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক ফাহাদ ইসলাম জানান, টঙ্গী এলাকায় তাদের প্রায় ২৫০ সদস্য কাজ করছেন। এ ছাড়া সংগঠনের সদস্য হতে আরও প্রায় ৭০০টি জীবনবৃত্তান্ত জমা পড়েছে। টঙ্গী সরকারি কলেজের স্নাতক তৃতীয় বর্ষের এই শিক্ষার্থীর দাবি, ছিনতাই, মাদক সেবনসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের হাতেনাতে ধরে তারা পুলিশের কাছে তুলে দেন।সংগঠনটির ফেসবুক পেজেও নিয়মিত আটক ব্যক্তিদের ভিডিও প্রকাশ করা হয়। পেজটির অনুসারী প্রায় ৫৪ হাজার। ছিনতাইকারী, মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ী সন্দেহে বিভিন্ন ব্যক্তিকে আটকের ভিডিওগুলোতে হাজার হাজার দর্শক দেখা যায়। অভিযানে সংগঠনের সদস্যদের নির্দিষ্ট পোশাক ও লাঠিসোঁটা নিয়ে চলতেও দেখা যায়। কখনো সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে মারধর বা অপমানজনক শাস্তি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছসংগঠনটির উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, ‘বাংলাদেশ ইয়ুথ রেভল্যুশন’ আত্মপ্রকাশ করে ২০২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর। এরপর তারা প্রায় ২৫০ জন ছিনতাইকারী ও মাদক ব্যবসায়ীকে আটক করে পুলিশের কাছে দিয়েছে।সংগঠনটির কেন্দ্রীয় মুখ্য সংগঠক সবুজ উদ্দিন ইকবাল জানান, তাদের সোর্সদের মাধ্যমে অপরাধের তথ্য পাওয়ার পর তারা অভিযান পরিচালনা করেন। অনেক সময় পুলিশও তাদের নির্দিষ্ট এলাকায় টহল দেওয়ার জন্য বার্তা দেয় বলে দাবি করেন তিনি।অপরাধী ধরার কাজ পুলিশের হলেও তারা কেন এ দায়িত্ব পালন করছেন এমন প্রশ্নের জবাবে সবুজ উদ্দিন জানান, নিজেদের মা-বোনদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই তারা এ কাজ করছেন। তার দাবি, সংগঠনের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ রয়েছে, যেখানে গাজীপুর মহানগর পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তাও যুক্ত আছেন।তবে টঙ্গীতে অপরাধের পাশাপাশি এ ধরনের বেসরকারি উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।টঙ্গী পূর্ব ও টঙ্গী পশ্চিম দুই থানার আওতাধীন এলাকায় গত বছরের জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছিনতাই, ছিনতাইচেষ্টা ও ডাকাতির ঘটনায় যথাক্রমে ৭১ ও ৭২টি মামলা হয়েছে। একই সময়ে টঙ্গী পূর্ব থানায় ৭০২ এবং টঙ্গী পশ্চিম থানায় ৪২৫ জনকে আটক করা হয়েছে। তবে মামলা ও আটকের এই হিসাব দিয়ে টঙ্গীর অপরাধের পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। কারণ, অনেক ভুক্তভোগী ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা করেন না। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে মামলা না নিয়ে সাধারণ ডায়েরি হিসেবে নথিভুক্ত করার অভিযোগও রয়েছে।স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, টঙ্গীর স্টেশন রোড, হোসেন মার্কেট, কলেজ গেট, আবদুল্লাহপুর বাসস্ট্যান্ড, সাতাইশ, কেরানীরটেক ও হাজী মাজার বস্তিসহ বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাইকারীদের তৎপরতা রয়েছে। বিশেষ করে সন্ধ্যা ও রাতে ছিনতাইয়ের ঘটনা বেশি ঘটে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।গত ২৬ আগস্ট রাত সাড়ে তিনটার দিকে সাতাইশ এলাকার বাসিন্দা শেখ মোহাম্মদ রুসেল পরিবারের সদস্যদের নিয়ে রংপুর যাওয়ার জন্য বাসার বাইরে বের হলে ছিনতাইয়ের শিকার হন। তার ভাষ্য, রাস্তায় বাসের জন্য অপেক্ষা করার সময় মুখ কাপড়ে ঢাকা তিন ব্যক্তি ধারালো অস্ত্র দেখিয়ে তার পরিবারের দুটি মুঠোফোন, স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা নিয়ে যায়। পরদিন তিনি টঙ্গী পশ্চিম থানায় মামলা করেন। তবে পরে কোনো মালামাল উদ্ধার বা আসামি গ্রেফতারের তথ্য পাননি বলে জানান তিনি।টঙ্গী পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মাকছুদুল আলম অবশ্য বলেন, ছিনতাই, মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধ আগের তুলনায় কমেছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের নিয়মিত অভিযান চলছে।গাজীপুর মহানগর পুলিশের দক্ষিণ বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার এস এম শফিকুল ইসলাম বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা পুলিশের দায়িত্ব। তবে এ কাজে সাধারণ মানুষের সহযোগিতাও প্রয়োজন। জনগণের সচেতনতা ও সহায়তা ছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন। পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে বলেও জানান তিনি।অন্যদিকে, অপরাধ দমনে এ ধরনের বেসরকারি দল গঠনকে গ্রহণযোগ্য মনে করছেন না মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি ও পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক।তিনি বলেন, বেসরকারি উদ্যোগে দল গঠন করে অপরাধ দমন করতে গেলে নতুন ধরনের অপরাধের সুযোগ তৈরি হতে পারে। কোনো ব্যক্তিকে মাদক ব্যবসায়ী বা ছিনতাইকারী হিসেবে চিহ্নিত করে মারধর কিংবা সামাজিকভাবে হেয় করার ঘটনাও ঘটতে পারে। এমনকি ব্যক্তিগত স্বার্থে কাউকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপনের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।অধ্যাপক ওমর ফারুকের মতে, ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি ও মাদকব্যবসার মতো অপরাধ দমনে পুলিশের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন হলেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।
সম্পাদকঃ নুর-আমিন
সহ-সম্পাদকঃ আরকে. রাসেদ খান
প্রকাশকঃ এম কে পুলক আহম্মেদ
E-mail: dainikauttareraniuja@gmail.com
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উত্তরের নিউজ